হোম কোয়ারেন্টিন: অভিজ্ঞতা থেকে ‘পেশাদার’ জনস্বাস্থ্যকর্মী হয়ে ওঠার গল্প

সায়েমা আক্তার

দিনটা ছিল ১৯ মার্চ, বাংলাদেশে একজন কভিড-১৯ এর রোগী শনাক্ত হয়েছে, চারদিকে নানা আলোচনা, ভীতি। কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারনে সবে অফিস থেকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, অফিসের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছি পরের সপ্তাহ থেকে বাসায় থেকে কাজ করার জন্য। কাজ শেষ করে অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি, এর কিছুক্ষণ পরেই বিকেল ৪টা নাগাদ এক কলিগের ফোন পাই। জানতে পারলাম, আমাদেরই একজন কলিগ, কোন একজন করোনা পজিটিভ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন না জেনে এবং সেই কলিগের সাথে যাদের কোন না কোন ভাবে ইন্টারেকশন হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টিনের নির্দেশ দিয়েছে অফিস। তার মধ্যে আমিও একজন। দিন দিন অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছিলো। তখনো হোম কোয়ারেন্টিনের বিষয়গুলো নিয়ে সরকার বা আমাদের দেশের অন্য সংস্থাগুলো এতটা ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। খবরটা শোনার সাথে সাথে মুহূর্তে অজানা আশংকায় আর ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। এতদিন টিভি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়টি সম্পর্কে জানলেও নিজের ক্ষেত্রে এটা করতে হবে কখনো ভাবিনি। কী করতে হবে, কী করব- ভেবে দিশেহারা হয়ে গেলাম। কীভাবে হোম কোয়ারেন্টিন করতে হবে তখনো এতটা ব্যাপকভাবে জানতাম না। তবে এটা জানতাম শুধু বাসায় থাকা নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে এই সময়।

বাবা মা, শ্বশুর-শাশুড়ি কেউ বেঁচে নেই। ভাই বোন সবাই ঢাকার বাইরে থাকেন। ঢাকায় স্বামী-স্ত্রী আমাদের দুজনের সংসার। আমার পরিবারে যেহেতু আমার বর ছাড়া আর কেউ ছিলনা তাই বুঝলাম আমাকে তার কাছ থেকেই আলাদা থাকতে হবে। আমার হাজবেন্ডে যেহেতু ডায়াবেটিস তাই আমার ভয় আর শংকা আরও বেড়ে গেল। নিজের আপনজনদের নিরাপদে রাখার তাড়ণা যে কি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে সে মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের অস্থির ভাব কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে আলাদা থাকতে হবে। আমি জেনে নিলাম হোম কোয়ারেন্টিনের নিয়মগুলো জেপিজির ওয়েবসাইটসহ ডাব্লিউএইচও গাইডলাইন দেখে। ভেবে নিলাম কি করে আমার হাজবেন্ডের সাথে এই বিষয়টা শেয়ার করব। করোনাভাইরাসের কারণে সে নিজেও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করছিল তখন। কীভাবে শুরু করব, কীভাবে বলব ভেবে নিলাম। নিজের মনের ভয়, আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তাকে চেপে রেখে সম্পূর্ণ বিষয়টা খুলে বললাম তাকে।

শুরুতেই ওর রিয়্যাকশন ছিল- তোমাকে হোম কোয়ারেন্টিন করতে হলে আমাকেও করতে হবে, কেননা আমিও তোমার সংস্পর্শে এসেছি। তুমি যদি ইন্ডাইরেক্ট টায়ার হও, আমিও তাই। শুরুতে সে মানতে চাইছিল না, যদিও জেপিজি থেকে পাওয়া ট্রেইনিং এবং অন্যান্য সূত্রে জেনেছি এক ঘরে থাকা যাবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে মাস্ক পরে এবং ১/২ মিটার দুরত্ব মেনে চলতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে আলাদা রুমে থাকাই শ্রেয় মনে করলাম আমি।

আট বছরের সংসার জীবনে এক বাসায় থেকে (রাগ, ঝগড়ার মাঝেও) কখনো আলাদা ঘুমানো হয়নি, বিশেষ করে রাতে একা ঘুমাতে আমি ভয় পেতাম ছোটবেলা থেকেই। সেখানে আমার আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত তাকে বোঝাতে অনেকটা বেগ পেতে হয়েছিল। ও বার বার বলছিল, আমার কিছু হবে না, মরলে দুজন একসাথে মরব, তুমি আলাদা থাকবে, আলাদা জিনিস ব্যবহার করবে তা হয় না…। আমি কেঁদে দিচ্ছিলাম, রেগে যাচ্ছিলাম শুধু মনে হচ্ছিলো এই যে পাশাপাশি থেকে কথা বলছি এতে করেও তো আমার থেকে ওর মাঝে ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে যেতে পারে। ভীত হয়ে পড়ছিলাম ভীষণ। যুক্তি দিয়ে, আবেগ দিয়ে অনেকটা সময় দিয়ে বুঝিয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা ১৪ দিন আলাদা থাকবো, আলাদা ঘরে। যেহেতু দুজনই চাকরিজীবী, সংসারে মানুষ মাত্র দুজন, তাই বড় বাসার প্রয়োজনীয়তা কখনো অনুভব করিনি। ছোট্ট একটা বাসায় আমাদের সংসার যেখানে একটাই বেডরুম সেপারেট, আর একটা স্টাডি কাম বসার ঘর যেটা ওপেন সাথে কিচেন এটাচড আর টয়লেট একটাই। যেহেতু বাসায় থেকে অফিস এর কাজ করতে হবে আমাকে, সময় কাটাতে হবে। সুতরাং, ঠিক হল আমি স্টাডি রুম এ থাকব। আলাদা করে নিতে লাগলাম সমস্ত জিনিস-বিছানা, বালিশ, কাঁথা, তোয়ালে, জামা কাপড়, প্লেট, গ্লাস, বেড শিট…। হঠাৎ নিজেকে কেমন জানি বিচ্ছিন্ন, অশৌচ মনে হচ্ছিলো। আমার স্পর্শ লাগা প্রতিটা জিনিস মুছতে লাগলাম, আলাদা করে দিলাম আমার হাজবেন্ড এর বিছানা বালিশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস। বুঝলাম এ এক কঠিনতম অবস্থা, অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। ক’টা জিনিস আলাদা করব! একটাই ওয়াশরুম থাকায় টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, টয়লেট্রিজ পর্যন্ত আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হল। আলমারি ওয়ারড্রোব, ফ্রিজ, কিচেনটপ, কেবিনেট, বইয়ের টেবিল, সু-কেস পর্যন্ত ডিসইনফেকটেন্ট করেছিলাম।

টিভি সংবাদে দেখছিলাম বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা হোম কোয়ারেন্টিনের নিয়মগুলো মানছেন না বা মানতে চাইছেন না। অনেক আলোচনা, সমালোচনা চলছে সবখানে এ নিয়ে, আমরা অফিসে কিংবা বাসায়ও এ নিয়ে অনেক আলাপ করতাম। নিজেও সমালোচনায় করেছি। কিন্তু একজন পাবলিক হেলথ প্রফেশনাল হয়েও আমি নিজেই প্রথমে এ ধাক্কাটা সামলাতে পারিনি, ভয় পেয়েছি, ঘাবড়ে গেছি, কেঁদেছি, ভীত থেকেছি সর্বক্ষণ। কলিগ, বন্ধুদের থেকে পাওয়া পরামর্শ আর অভয় পেয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছি ধীরে ধীরে।

কিন্তু দেশের আপামর জনসাধারণদের ক্ষেত্রে কী হবে, কীভাবে তারা বুঝবে বা মানবে সেটা ভেবেই অস্থিরতা কাজ করছিল। শুরুতে মনে হয়েছে এই হোম কোয়ারেন্টিনের ব্যাপারটা কাউকে জানানো যাবেনা, কেননা তাতে অন্যরা আমাদের এড়িয়ে চলতে পারেন, ভয় পেতে পারেন, তাই সিদ্ধান্ত নিলাম কারো সাথে এই বিষয়টা শেয়ার করবোনা যে আমি হোম কোয়ারেন্টিনে থাকবো। এমনকি কাছের কোন আত্মীয়দের সাথেও নয়। কিন্তু অবশ্যই নিজেরা যতটা পারি সতর্ক থাকবো আর পৃথক থাকবো অন্যদের থেকে। এই সময় এসে আমি নিজেকে সব কাজ থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব রান্না, ধোয়া, ঘরের অন্য সব কাজ থেকে বিরত রেখছি। ঘরের সব কাজ আমরা সাধারণত দুজন মিলে করার অভ্যাস, রান্নাটা বরাবরই আমার হাজবেন্ড করে, আমি তাকে সাহায্য করে দিতাম, ঘর গোছানো আর পরিষ্কারের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। এক্ষেত্রে সব আমার বরের উপর বর্তালো। একাই করছে সব কাজ, সাথে যুক্ত হয়েছে ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়াসহ অন্যান্য গৃহস্থালি বাড়তি কাজ। আর সাথে অফিস এর কাজ তো চলছেই।

প্রথম দুদিন খুব মন মরাভাবে কেটেছে, কথা বলতে গেলেও ভয় লাগত, একসাথে বসে চা খাওয়া, গল্প করা সব বাদ দিতে হল। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগল, যখন আমি নামাজ পড়তে যেতাম। দীর্ঘদিন ধরে দুজন মিলে বাসায় জামাতে নামাজ পড়ার অভ্যাস আমাদের। জায়নামাজ আলাদা করে, একা একা নামাজ পড়তে যেয়ে চোখে পানি চলে আসত। কিভাবে একটা ছোট্ট ভাইরাস এক বাসায় থাকা দুজন মানুষকে আলাদা করে দিল। লাইফস্টাইলটাই পরিবর্তন করে দিল তাই ভাবছিলাম বার বার। অদ্ভুতভাবে খেয়াল করলাম, কেমন যেন নিজের অজান্তে নিজের হাতকে অবিশ্বাস করছি, বার বার হাত ধুচ্ছি, নিজেকে ভয় পেতে লাগলাম। আমার কোনো ধরা ছোঁয়ার কারণে আমার হাজবেন্ড এর না কোনও ক্ষতি হয়ে যায়, এই ভেবে…। এই ভয়ে…।

সময়টা বড় অদ্ভুত লাগছিল। কিছু কমন জিনিস আছে, ফ্রিজ, আলমারি, কিচেনটপ, বেসিন, ওয়াশ রুম, ডাইনিং, এসি বা টিভির রিমোট, কোন কিছু ধরলে সাথে সাথে এন্টিসেপ্টিক দিয়ে মুছে ফেলতে হচ্ছে, হাজবেন্ড এর সাথে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ভিডিও চ্যাট এ কথা বলেছি, আলাদা ঘরে খাবার খাচ্ছি, আর প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছিলাম এ বড় কঠিন কাজ, যা পরিবারের সদস্যদেরর সাহায্য ছাড়া এক প্রকার অসম্ভব। পুরো সময়টা আমরা দুজন দুজনকে সাহস দিয়েছি, সাহস নিয়েছি। বার বার সান্তনা দিচ্ছিলাম, আমি তো ইনফেকটেড না, কিন্তু তাও এক্সপোজোর হিসেবে নিজেকে নিরাপদ ও ভাবতে পারছিলাম না। আমি হোম কোয়ারেন্টিনে, অফিস এর কাজ নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম। দেশে আর ও কভিড-১৯ এর রোগী শনাক্ত হচ্ছিল, আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সচেতনতা বা সুবিধা না থাকা অনেক কারণেই মনে হচ্ছিল- কী হবে, কীভাবে আমরা সবাই এই ভাইরাস থেকে রক্ষা পাব? ভাবছিলাম জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কী দিতে পারছি এদেশের জনসাধারণকে! কী করতে পারছি নিজেকে সেইফ রাখার চেষ্টা করা ছাড়া? বাসা থেকে বের হতে পারছিনা, মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারছি, কিট নেই, পিপিই নেই, ট্রেনিং নেই, আশাজাগানিয়া কোন ব্যবস্থা দেখতে পারছিনা সরকারের তরফ থেকে। শুধু দেখতে পারছি উচু মহল থেকে শুরু করে সাধারণদের মধ্যে ব্যাপক ভুল ধারণা এর অসচেতনতা। আলাপ হত কলিগদের সাথে, বাসায় আমার হাজবেন্ড এর সাথে আর হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম।

জনস্বাস্থ্য কীভাবে ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনে মিশে আছে এবং পেশাদার জনস্বাস্থ্য কর্মী হবার জন্য ডিগ্রি, কাজের অভিজ্ঞতা, গবেষণার কাজে জড়িত থাকা ছাড়াও কী করে একজন ব্যক্তি শুধু বোধ আর সচেতনতা দিয়ে “পেশাদার” জনস্বাস্থ্য কর্মী হয়ে উঠতে পারে সেটা আমি নিজের হোম কোয়ারেন্টিনের সময়ে পর্যবেক্ষণ করেছি খুব কাছ থেকে। এক-দু দিনের ব্যবধানে আমি লক্ষ করলাম আমার বর (সাইফ, বয়স-৩৮, ব্যবসায়ে যুক্ত) তার এর মাঝে বেশ কিছু পরিবর্তন। ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত খেতে ভালবাসা, স্বাস্থ্য বিষয়ে ভীষণ অসচেতন এই মানুষটা আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করছে- করোনার ট্রেনিংয়ে কী শিখলাম, কী জানি এসব নিয়ে। আর নিয়মিত আলাপ হয় বলে করোনাভাইরাস এর ব্যাপারে অথেন্টিক সোর্স খুঁজে কিছু কিছু পড়াশুনা করে নিজেকে আপডেট করল। তারপর দেখলাম একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে সে নিজেকে যুক্ত করে নিয়েছে। আমার সাথে প্রথমে কোনও কিছু পরামর্শ না করেই সে তার উদ্যোগে এ লেগে পড়ল। কথা বলতে ভালবাসা আর সহজ ভাষায় বোঝানোর ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে শুরু করল ‘করোনা সচেতনতা অভিযান’ একদম একা আর ঘর থেকেই। শুরু করলো আমাদের চারতলা বিল্ডিং এর দারোয়ানকে দিয়ে। হাত ধোয়ার নিয়ম, মাস্ক এর ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা আর স্যানিটাইয বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করল। সহজ ভাষায় তাকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের উৎস, কারণ এবং এ থেকে বেঁচে থাকার উপায়গুলো বর্ণনা করল।

শুরুতে বুঝতে না চাইলেও পরে আস্তে আস্তে নিজ উৎসাহে মানতে শুরু করল। গেটের কাছে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করল। শিখিয়ে দিল সহজে এবং কম খরচে হ্যান্ড ওয়াশিং লিকুইড বানাবার নিয়ম। (১.৫ লিটার পানিতে ৪ চামচ ওয়াশিং পাঊডার মিশিয়ে- আইসিডিডিআর’বি এর এক গবেষণায় প্রমাণিত মিশ্রণ- আমার থেকে জেনে নিয়েছিল)। নিজেই এক বোতল বানিয়ে উৎসাহ দিল। সাদা কাগজে লাগিয়ে দিল হাত ধোয়ার নিয়ম আর করোনাভাইরাস সতর্কতামূলক কিছু বার্তা। এরপর শুরু করল বিল্ডিং এর চারতলায় মোট সাতটা ফ্যামিলির লোকদের বোঝানো। বিভিন্ন পেশাজীবীর আবাস ছিল (ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ব্যাংকার, বেসরকারি কর্মকর্তা) এক্ষেত্রে সে প্রতিটি বাসার তুলনামূলক তরুণ সদস্যদের (১৬-২৫) দিয়ে, বাসার নিচে, ছাদে যেখানে যার সাথে দেখা হয়, তাদের দায়িত্ব দিয়ে দিল যার যার পরিবা্রকে সচেতন করতে। ওর কথায় তারা উৎসাহ পেল এবং নিজ নিজ বাসার বয়স্ক, অপেক্ষাকৃত ছোট সদস্য বিশেষ করে নারীদের বোঝানোর দায়িত্ব দিল। আগে প্রতিবেশিদের সাথে ‘হাই’, ‘হ্যালো’ সম্পর্ককে এরেকটু ঝালিয়ে নিল। পাশের বাসার মুরুব্বী চাচাকে ভালভাবে বুঝিয়ে সচেতন করে ছাড়ল। এমন হল সেই চাচা হাতে হ্যান্ড রাব নিয়ে ঘুরছেন, আর ওকে দেখিয়ে মুচকি হেসে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি এখন এসব মানছেন। তার কর্মক্ষেত্রে এটা নিয়মিত চর্চা করছেন বলেও জানালেন। তাকে দেখে তার কয়েকজন কলিগ এবং বন্ধুও উৎসাহিত হয়েছে বলে জানালেন অত্যন্ত আগ্রহের সাথে।

সেকেন্ড ধাপে শুরু করলো বাসার কাছেই এলাকায় যাদের কাছ থেকে নিয়মিত সবজি, ফল কিনতো সেই মামাদের কাছে করোনাভাইরাস সচেতনতামূলক কার্যক্রম। দেখত তারা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে, কখনো হা্তে হাত দিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গল্প করছে, আর হাসাহাসি করছে (লোকে মুখে জেনেছে করমর্দন করা যাবেনা, একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলতে হবে- এটা ওদের কাছে হাসির বিষয় মনে হয়েছে- যা খুব স্বাভাবিক তাদের জন্য)। পরিচয় এর সূত্রে সবজি বিক্রেতার সাথে খাতির থাকায়, উনাকে দিয়ে শুরু করল দ্বিতীয় কাজ। একইভাবে তাকে করোনাভাইরাস বিষয়ে সতর্ক করা, মাস্ক ব্যবহারের গুরুত্ব, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার নিয়ম, অনেক লোক তার কাছ থেকে কিনতে আসা বলে তার সতর্ক থাকার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলল। শুরুতে মানতে চায়নি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, কৌতুক হিসেবে নিয়েছে, কিন্তু আমার স্বামী হাল ছাড়ার পাত্র নয়, একইসাথে সম্মান এবং শাসন এর মাধ্যমে বুঝিয়ে বাধ্য করেছে তাকে সচেতন করতে। তাকে এবং সাথের আরও দুজন বিক্রেতাকে কিনে দিল মাস্ক এর হ্যান্ড গ্লাভস। সেই সবজি মামার পাশে বসেন আরও দুজন পেঁয়াজ বিক্রেতা, আর ফল বিক্রেতা মামা, মুচি মামা, ফেরিওয়লা, একে একে সবাই কে বলে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং একজন যখন মেনে চলা শুরু করল অন্যরা ও আগ্রহ পাওয়া শুরু করল।

তারপর থেকে সবাই মাস্ক পরে বসতে দেখা গেছে। যখন যেখানে যেত বাজারে মুদি দোকানে, ফার্মেসিতে লোকদের বোঝাত, মুরুব্বিদের মসজিদে না গিয়ে বাসায় নামাজ পড়ার জন্য অনুরোধ করত। কয়েকজন তার কথায় মোটিভেট হয়েছেন। কিন্তু ধর্মান্ধ লোকের সংখ্যা আমাদের সমাজে সবসময় বেশি, তাই এখনো এ বিষয়ে সফলতা খুব একটা পায়নি। কিন্তু আমাদের বিল্ডিং এর দুজন মুরব্বি এর কজন অল্পবয়সী চার-পাঁচজন ছেলেদের বুঝিয়ে বাসায় নামাজ পড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাসার কাছেই নিয়মিত হাঁটতে যেত যেখানটাই, যেখানে প্রায় বিভিন্ বয়সী (৮-১৬) ছেলেমেয়েরা খেলাধুলাা করত, সাইকেল চালাত। অনেক বয়স্করা হাঁটতে আসতেন। তাদের পরিচিত, অপরিচিত অনেককে বলার চেষ্টা করেছে, যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে। বাচ্চাদের একসাথে হয়ে খেলাধুলাা করা থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। বাচ্চারা প্রথম প্রথম হাসত, বলত- আমাদের কিছু হবে না, এগুলো বিদেশের ভাইরাস, তখন তাদের ধমক ও দিয়েছে। পরিচিত আঙ্কেল হবার সুবাদে সম্মান রক্ষায় অথবা ভয়ে বাচ্চারা বাইরে বেরিয়ে খেলা কমিয়েছে। এরপর তো সরকারি আদেশে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা, অঘোষিত লকডাউন শুরু হল। আর পথে দেখা হলে বলতো- ‘আঙ্কেল আমরা এখন খেলতে যাইনা’। কিংবা- ‘আঙ্কেল স্যানিটাইজার দিন, হাত পরিষ্কার করব…’ (উল্লেখ্য সবসময় তার পকেটে স্যানিটাইজার রাখতো)।

এভাবে, শিশু, কিশোর, বয়স্ক, স্বল্পশিক্ষিত সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে শিক্ষিত চাকুরীজীবী প্রতিবেশীদের সচেতন করা শুরু করল। ওর এতো আগ্রহ দেখে বিল্ডিং এর অনেকে আরও সচেতন হয়ে উঠলো। একদিন পর পর পুরো বিল্ডিং এর সব ফ্লোর এর সিঁড়ি, রেলিং, প্রতিটা দরজার নব, তালা, জানালায়, ছাদে ডিসইনফেক্টেট ছিটিয়ে পরিষ্কার করা শুরু করল। এক্ষেত্রে বিল্ডিং এর অন্য সদস্যারাও যুক্ত হতে লাগল। এখন পালা করে বিল্ডিং ক্লিন করা হয়। দারোয়ান এর কাছ থেকে নিয়মিত আপডেট নিচ্ছে এখন। যেদিন তাকে বাইরে বাজার বা অন্য কোন জরুরি কাজে বের হতে হচ্ছে, তখন যাদের সাথে যেখানে দেখা হচ্ছে পরিচিত, অপরিচিত তাদের সতর্ক করেছে, কখনো কখনো তাকে দেখে নিজে থেকেই কেউ কেউ জানাচ্ছে যে তাদের পরিবারের সদস্যরাও এখন সচেতন হয়েছে বলে জানাচ্ছে।

এই উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু অর্থনৈতিক সহযোগিতা কীভাবে করা যায় সেবিষয়ে আলাপ করলো আমার সাথে। বাইরে বের হওয়া অনিরাপদ বলে চাল-ডাল কিনে কয়েকজনকে দেবার ইচ্ছা থাকলেও বাইরে না বেরিয়ে কী করে কন্ট্রিবিউট করা যায় তা খুঁজে দেখলাম। আর পেয়ে গেলাম কিছু অথেনটিক সোর্স। তার মধ্যে ‘এক টাকার আহার’ নামে সামাজিক সংগঠন যেটা বিদ্যানন্দ নামে পরিচিত, যারা এই দুর্যোগে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। নির্দ্বিধায় ডোনেট করলাম বিকাশের মাধ্যমে সামর্থ্য অনুযায়ী। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারের সূত্রে নিজেদের চেনা-জানা কয়েকজনের মারফতে যারা অভাবী, কর্মহীন মানুষদের খাবার, ওষুধ, নিত্য পণ্য পৌঁছে দেবার কাজ করছে (সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে) তাদের সাথেও যুক্ত হলাম।

ঘরে বসে আর একটা কাজ শুরু করলাম। সেটা হল নিয়মিত গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফোনে তাদের সচেতন করার কাজ করতে লাগলাম। নিজের জানার মধ্যে যা কিছু আছে অথেন্টিক পরামর্শ আর তথ্য দিতে লাগলাম তাদের। গ্রামের বাড়িতে থাকা, বিদেশে থাকা আত্মীয় কেউ বাদ যাননি। যদিও সবাই শিক্ষিত কিন্তু তা সত্ত্বেও খেয়াল করলাম, করোনাভাইরাসের ব্যাপারে সিরিয়াসনেস একেবারে নেই বললেই চলে। শুরু করলাম সকাল বিকাল ফোন কল। যাকে যেভাবে বোঝানো যায় বড় থেকে ছোট সবার সাথে আলাদা করে কথা বলে বোঝাতে লাগলাম। আমার বর যেহেতু কথা বলতে ভালবাসে আর বোঝাতে পারে ভাল, সেই অ্যাডভান্টেজ নিয়ে আমি তাকে উদ্বুদ্ধ করলাম গ্রামের আত্মীয়দের সচেতন করে তোলার কাজে। যদিও কাজটা ছিল অনেক কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিরক্ত হয়েছেন, বার বার একই কথা বলার কারণে রাগ হয়েছেন, হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন কিন্তু হাল ছাড়িনি। এখনও চলছে। অনেক ক্ষেত্রে তারাও সচেতন হয়ে উঠেছে। ঘরের বাইরে না বের হওয়া, মসজিদে জামাতে নামাজ না পড়ে বাসায় নামাজ পড়ার ব্যাপারে বোঝানো, বাচ্চাদের ভলান্টিয়ের রোল দেয়ায় ওরাও এখন সচেতন হয়ে উঠেছে। প্রমাণ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই ফোন করে আমাদের জানাচ্ছে।

কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়

  • তুলনামুলক শিক্ষিত কিন্তু অসচেতন লোকেদের বোঝানো কঠিন। কেননা তারা নিজেদের জানার বাইরে কারো কাছ থেকে কিছু বুঝতে বা শিখতে চাননা। ইগো কিংবা সমস্যার গুরুত্ব না বোঝার কারণে।
  • যারা কিনা স্বল্পশিক্ষিত অথবা ইয়াং গ্রুপ তাদের যদি উদ্বুদ্ধ করা যায়, তবে তাদের মাধ্যমে আরো সচেতন গ্রুপ তৈরি করা সম্ভব।
  • বারবার করে তথ্য প্রদান করা এবং যে যে ভাষায় বোঝেন তাকে সে ভাবেই বোঝাতে হবে। সম্পর্কের দিকে খেয়াল রেখে বোঝাতে হবে।
  • অপেক্ষাকৃত নিয়মিত মসজিদে যাওয়া বয়স্ক গ্রুপের লোকেদের বোঝাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। শিক্ষিত, চাকুরীজীবীদের মধ্যে সচেতনাতার অভাব দেখেছি। বেশিরভাগই বলছে- ‘মসজিদ আল্লাহ্‌র ঘর’, ‘মরণ আসলে মরবো’, ‘যে কইদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন মসজিদ ছাড়ব না।’
  • নিজের ঘরের লোকদের দিয়ে শুরু করা, নিজের পরিসরে যাকে যেভাবে সম্ভব উদ্বুদ্ধ করা, সাহায্য করা সঠিক তথ্য আর উপায় দিয়ে।

আসলে ভেবে দেখলাম সচেতনতার উপর এই মুহূর্তে জরুরী আর কিছু নেই। যে রোগ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার জন্য প্রতিরোধ কতটা জরুরী তা বুঝতে সময় না নেয়ায় অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে কিছু না করার মাঝে ও আমি মনে করি একটা বড় কাজের ভাগীদার হতে পেরেছি।

আমাদের এই ১৭ কোটি জনসংখ্যার গরীব দেশে সরকারের পক্ষে একা কিছু সম্ভব হবে না যতক্ষণ না আমরা নিজেদের জায়গা থেকে কিছু করার চেষ্টা করব। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য নিয়ে জানার বা পড়ার দরকার পড়বে না, দরকার একটা সচেতন আর কর্মোদ্যোগী মন। এক্ষেত্রে আমি কৃতজ্ঞ আমার হাজবেন্ডের কাছে নিজের উদ্যোগে এই ছোট ছোট কাজগুলো করে আমাকে এটা ভাবিয়েছে যে- জনস্বাস্থ্য আসলে আমার কাছের, পাশের মানুষটার ভাল থাকা। তাকে দিয়েই তো আমার দেশ।

আমার কোয়ারেন্টিন সময় হয়ত আমার বরকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছে। সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব থেকে যা কিছু করেছে বা করবে, সামনে তাতে আমি অন্তত এটা বুঝেছি, মহামারীর এ বৈশ্বিক দুর্যোগে যার যার জায়গা থেকে কিছু করার এখনই সময়। জীবনকে যেভাবে এক ক্ষুদ্র ভাইরাস থমকে দিয়েছে তাতে করে আর কখন সময় হবে কে বলতে পারে!

সায়েমা আক্তার, সিনিয়র গবেষণা সহযোগী, ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

--

--

BRAC James P Grant School of Public Health

BRAC JPG School of Public Health, Bangladesh tackles global health challenges affecting disadvantaged communities through Education Training Research & Advocacy